আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী

অর্থনৈতিক যুদ্ধ, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি

এই পৃথিবী কখনােই যুদ্ধবিহীন ছিল না। তবে সম্প্রতি ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরােপে যুদ্ধ ফিরে আসাটাই অনেক বড় ঘটনা। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর হবে কি না, সে প্রশ্ন মাথায় নিয়েই বলা যায়, এখন যে যুদ্ধ শুরু হলাে—এটা কি প্রথম অর্থনৈতিক বিশ্বযুদ্ধ?

অর্থনৈতিক যুদ্ধ

অর্থনৈতিক যুদ্ধ বলতে একটি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করার জন্য বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরােপ করা এবং দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হ্রাস করাকে বােঝায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক যুদ্ধের মূল লক্ষ্য প্রতিপক্ষ দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানা। এ যুদ্ধের কিছু অস্ত্র হলাে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, পণ্য বর্জন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক বৈষম্য, মূলধন সম্পদ হিমায়িত করা, কালাে তালিকাভুক্তি, শক্রর সম্পদ বা সরবরাহ লাইনের দখল বা নিয়ন্ত্রণ, সাহায্য স্থগিত করা, বিনিয়ােগ এবং অন্যান্য মূলধন প্রবাহ নিষিদ্ধ কা ও বাজেয়াপ্ত করা। প্রাচীন গ্রিসে পেলােপােনেশিয়ান যুদ্ধের (৪৩১-৪০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) আগে থেকেই অর্থনৈতিক যুদ্ধের প্রচলন ছিল।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব

যুদ্ধের অনেকগুলাে ক্ষতিকর দিক আছে। মৃত্যু ও অনিশ্চয়তা তাে আছেই, আরও আছে । অবকাঠামাের ধ্বংস, কর্মক্ষম মানুষের হার : কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ, পণ্যের স্বল্পতা, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া, রাষ্ট্রীয় ঋণ বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক অর্থনীতির কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়া। ব্রিটিশ সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, লেখক ও শান্তিবাদী রালফ নর্মান অ্যাঞ্জেল তার দ্য গ্রেট ইলিউশন বইয়ে লিখেন, আসলে একটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি এত বেশি যে, যুদ্ধ করে কেউ আসলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হয় না।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। যুদ্ধের সময় পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে নিত্য প্রয়ােজনীয় দ্রব্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। আক্রান্ত দেশে বৈশ্বিক বিনিয়ােগ বন্ধ হয়ে যায়, সরকারি দেনা বৃদ্ধি পায়, ফলে ভবিষ্যতে করারােপের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধের খরচ বাড়লে সরকারের পক্ষে অন্যান্য খাত যেমন উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ কমে যায়। যুদ্ধের ফলে জিডিপি কমে গিয়ে। দীর্ঘস্থায়ী মন্দা দেখা দেয়।

বর্তমান পরিস্থিতি

ইউক্রেনে সামরিক হামলা শুরু করার পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে। তাদের ধারণা, রাশিয়াকে অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারলে তারা সামরিক অভিযান থেকে পিছু হটবে। রাশিয়ার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলাের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরােপ করেছে পশ্চিমা দেশগুলাে। যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ১৩টি রুশ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়ােগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরােপ করা হয়েছে। বাদ যায়নি রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় সম্পদ তহবিল, অর্থ মন্ত্রণালয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়াও কিছু কিছু নিষেধাজ্ঞা দিতে শুরু করেছে।

নিষেধাজ্ঞায় শীর্ষ দেশ

দেশ  নিষেধাজ্ঞার পরিমাণ
রাশিয়া ৫,৫৩২টি
ইরান ৩,৬১৬টি
সিরিয়া ২,৬০৮টি
উত্তর কোরিয়া ২,০৭৭টি

পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞা আরােপ করেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। রুশ জ্বালানি কোম্পানি, রেল, পরিবহন ও টেলিকম কোম্পানিতে মার্কিন ঋণ ও বিনিয়ােগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরােপ করা হয়, যাতে রুশ প্রতিরক্ষা, মহাকাশ ও সামুদ্রিক খাতে উন্নত প্রযুক্তি স্থানান্তর না হয়, এবং রুশ বাহিনীগুলাের আধুনিকীকরণ ব্যাহত হয়। রুশ এয়ারলাইন্স ও ব্যক্তিগত জেটের ইইউ, যুক্তরাজ্য ও মার্কিন আকাশসীমা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া কতিপয় রুশ ব্যাংকের সােসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন্স (SWIFT) ব্যবহারের সুযােগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মালিকানাধীন বেলজিয়ামের এ প্রতিষ্ঠান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলােকে নিরাপদ বার্তা বিনিময় সুবিধা প্রদান করে। আর্থিক বিধিনিষেধের কারণে মার্কিন ডলার ও রুশ রুবলের বিনিময় হার ১ ডলারে ১৩১ রুবলে ঠেকেছে। পিক ট্রেডিং রিসার্চের ভাষ্য অনুযায়ী, দোনেৎস্ক ও লুহানস্কে রুশ সামরিক অভিযানের পর গমের দাম ৪০%, অপরিশােধিত জ্বালানি তেলের দাম ২০%, ভুট্টার দাম ১২%, পাম ও সয়াবিন তেলের দাম যথাক্রমে ২০% ও ১২.৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় রপ্তানিকারক রাশিয়া। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল উৎপাদক। ইউরােপের মােট প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার ৪০% এবং জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ রাশিয়া একাই সরবরাহ করে।

তাই রাশিয়া যদি গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহে হস্তক্ষেপ করে, ইউরােপের অর্থনীতি যে চরম জ্বালানি সংকটে পড়বে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্বের মােট সূর্যমুখী তেলের ৬০% উৎপাদন করে। আবার বিশ্বের মােট গমের ২৮,৯% উৎপাদিত হয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনে। ইউরােপের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৯%ই জৈব জ্বালানিভিত্তিক, যা আসে মূলত রাশিয়া থেকেই। যুদ্ধ রু হওয়ায় ইউক্রেন পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না, আর রাশিয়াকে রপ্তানি করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়াকে একঘরে করার নীতি সফল হলেও এতে বিপদে পড়বে সমগ্র বিশ্ব।

Md. Mahabub Alam

I am a committed educator, blogger and YouTuber and I am striving to achieve extraordinary success in my chosen field. After completing Masters in Anthropology from Jagannath University, I am working as Chief Accounts Officer in a national newspaper of the country. I really want your prayers and love.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button